বারাসাত (২৮ অক্টোবর '২৬):- মণ্ডপে লোকসমাগমের নিরিখে কলকাতার দুর্গাপুজো যদি ভারত বিখ্যাত হয়ে থাকে, তাহলে কালীপুজোর জন্য উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সদর শহর বারাসাত গত শতাব্দীর সাতের দশকের শেষলগ্ন বা বাম জমানার প্রথম ভাগ থেকেই জনমানসের কাছে চর্চার বিষয় হয়ে রয়েছে।
বারাসাতের কালীপুজো মোটামুটি তিন-চারটে জনবহুল রাস্তাকে কেন্দ্র করেই বিস্তার লাভ করেছে। এর মধ্যে বারাসাত ডাকবাংলো মোড় থেকে যে রাস্তা কলোনি মোড় হয়ে কৃষনগর হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে এগিয়েছে সেই রাস্তার আশেপাশের কয়েকটা কালীপুজো যেমন দীর্ঘদিন ধরে চর্চার বিষয় হয়ে রয়েছে, তেমনই বারাসাতের চাঁপাডলি মোড় থেকে যে রাস্তা টাকীর দিকে এগিয়েছে সেই রাস্তা সংলগ্ন কয়েকটা কালীপুজোও বর্তমানে চর্চার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে, এর সাথে সাথে বারাসাত রেলস্টেশনের দুধারের বেশ কয়েকটা কালীপুজো জনপ্রিয়তার লক্ষ্যে এই মুহূর্তে সর্বাধিক এগিয়ে রয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে বারাসাতের কালীপুজোর আয়োজক সংস্থাগুলোর সাথে বেশ কয়েকটা প্রশাসনিক বৈঠক সেরে ফেলেছে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা প্রশাসন।
পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট অনুযায়ী আগামী ৮ নভেম্বর রাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় রীতি ও রেওয়াজ মেনে শক্তির আরাধনা রূপে দেবী কালীকার পুজো করা হবে।
কলকাতার 'চোরবাগান'-এর দুঃখজনক স্মৃতি ও প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের নানাদিকে একাধিক ব্যর্থতার ছবি সামনে এসে পড়ায় বারাসাতের কালীপুজোকে নির্বিঘ্নে উতরে দিতে ইতিমধ্যে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা প্রশাসন।
এখনো পর্যন্ত বিভিন্ন পুজো আয়োজকদের তরফ থেকে যা শোনা গেছে তার উপর ভিত্তি করে বলা যেতে পারে থিম বা ভাবনা ভিত্তিক কালীপুজোর জন্য এবার কালীপুজোর সময় বারাসাতে জনপ্লাবন ঘটতে চলেছে।যদিও নিন্দুকদের মতে বারাসাতে কোনো থিম নয় বরং দর্শনীয় মণ্ডপই এখানে জনসমাগমের একমাত্র প্রধান কারণ।
বারাসাতের প্রথম সারির কালীপুজো বলতে বিখ্যাত হয়ে গেছে মূলতঃ গোটা চারেক পুজো। এদের মধ্যে রয়েছে বারাসাত থানা লাগোয়া 'কে এন সি রেজিমেন্ট'-এর কালীপুজো। এই বছর এরা গুজরাতের স্বামী নারায়ণ মন্দির-এর আদলে নিজেদের মণ্ডপ গড়ছে।
বারাসাত রেল স্টেশনের ৫ নম্বর প্লাটফর্মের পাশে রয়েছে 'পায়োনিয়ার পার্ক'। মণ্ডপের কাছেই পুষ্করিণী থানায় বেশ কয়েকবছর ধরে এখানকার আয়োজকরা ভারতের সেই সব বিখ্যাত মন্দিরের আদলে মণ্ডপ বানাচ্ছে যা নদী বা সমুদ্র কেন্দ্রীক। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই বছর এখানে নির্মিত হচ্ছে মণিকর্ণিকা ঘাট।
অন্যদিকে ১২ নম্বর জাতীয় রাজপথের ধারে লালী সিনেমা হলের বিপরীতে অবস্থিত 'রেজিমেন্ট' বানাতে চলেছে মহামায়ার দেবপ্রসাদ।
বিভিন্ন পুজো আয়োজকদের তরফ থেকে যে খবর এসে পৌঁছেছে তার উপর ভিত্তি করে বলা যায় এই বছর ১২ নম্বর জাতীয় রাজপথ সংলগ্ন 'সন্ধানী ক্লাব' মায়ানমার বুদ্ধ মন্দিরের আদলে তাদের মণ্ডপ নির্মাণ করছে। 'জাগৃতি সংঘ' ফিরে দেখা ডোকরা শিল্প-কে ভাবনায় রেখে তাদের মণ্ডপ পরিকল্পনা করেছে। 'রাইজিং স্টারস' নামের আড়ালে কিশোর স্পোর্টিং ক্লাব পুণ্যতীর্থ হিংলাজ-এর আদলে এবছর তাদের মণ্ডপ সাজাচ্ছে, আবার 'ন'পাড়া কালচারাল স্পোর্টিং ক্লাব'-এর এই বছরের থিম স্মৃতির বন্ধন। 'শক্তি মন্দির'-এর এবারের থিম এক টুকরো মেঘ।
বারাসাত কলোনি মোড় সংলগ্ন 'লক্ষ্মীনারায়ণ কলোনি কল্যাণ সমিতি' ওরফে নবপল্লী অ্যাসোসিয়েশন শক্তি রূপে ভারতমাতা-কে ভাবনায় রেখে তাদের মণ্ডপ গড়ছে দিল্লীর লালকেল্লার আদলে, অন্যদিকে নবপল্লী বয়েজ স্কুল লাগোয়া 'নবপল্লী ইছাপুর সর্বজনীন'-এর এবারের থিম স্বর্ণকমল।
১ নম্বর রাজ্য সড়ক (বারাসাত-ব্যারাকপুর রোড) এবং ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশাপাশি ২ নম্বর রাজ্য সড়ক (টাকী রোড)-এর দুধারের বেশ কয়েকটা কালীপুজোও বেশ কয়েকবছর ধরে আলোচনার মধ্যে রয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে 'শতদল সংঘ', এবার এদের ভাবনার বিষয় শিবানী ধাম, 'বিদ্রোহী ক্লাব' এবার ব্যাঙ্ককের গোল্ডেন বুদ্ধ টেম্পল-এর আদলে তাদের মণ্ডপ নির্মাণ করছে। 'বালকবৃন্দ স্পোর্টিং ক্লাব'-এর এবারের থিম ভাগ্যচক্র। 'যুবগোষ্ঠী' এই বছর জ্যোতির্ময় দ্য লুমিনাস-কে থিম ধরে যেমন তাদের মাতৃমণ্ডপ সাজিয়ে তুলছে, তেমনই 'আগুয়ান সংঘ' এবার শস্য শ্যামলা বাংলা-র আদলে তাদের মণ্ডপ নির্মাণ করছে। শহর বারাসাত থেকে টাকী রোড ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে এক বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের বিপরীতে 'বামনমুড়া অ্যাসোসিয়েশন' আবার তাদের মাতৃমণ্ডপ বানাচ্ছে লক্ষ্মীনারায়ণ গোল্ডেন টেম্পল-এর আদলে।
তবে বারাসাতবাসীদের কাছে এবার চর্চায় রয়েছে নিবেদিত পল্লীর 'ছাত্রসংঘ যুববৃন্দ' আয়োজিত কালীপুজো। সংগঠনের ব্যানার অনুযায়ী এই পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক 'ভারতীয় জনতা পার্টি'-র পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ শাখার সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর বিশেষ অনুগ্রহভাজন রূপে চিহ্ণিত সুবীর শীল, অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা রূপে রয়েছেন 'ভারতীয় জনতা পার্টি'-র বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সভাপতি দীপঙ্কর চক্রবর্তী। তাই ধরেই নেওয়া যাচ্ছে, এই বছর এখানকার মাতৃমূর্তি ও মাতৃমণ্ডপের উদ্ঘাটন উপলক্ষ্যে এখানে একদিকে যেমন কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরের একাধিক মন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন ঠিক সেভাবেই টলিউড ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রীর একাধিক অভিনেতা ও অভিনেত্রীও এখানে উপস্থিত হবেন। এই বছর মঙ্গল ধ্বনি-কে ভাবনায় রেখে মণ্ডপসজ্জা করছে এই সংগঠন।

Comments
Post a Comment