বহুলচর্চিত গেরুয়া তাণ্ডবের আবহে জন্মাষ্টমীর প্রেক্ষাপটে নজরে এল এক গেরুয়াধারীর সেবা


হীরক মুখোপাধ্যায় 

বারাসাত (৪ সেপ্টেম্বর '২৬):- গতকাল তখন সবে রাতের প্রথম প্রহর শেষ হয়েছে, কর্মের তাড়নায় দাঁড়িয়ে ছিলাম বারাসাতের ডাকবাংলো মোড়ে। এটা এমন একটা তিনমাথার মোড় যেখান থেকে উত্তরমুখী যাত্রা করলে উত্তরবঙ্গের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, পূর্বমুখী যাত্রা করলে হাসনাবাদ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া যায় আর দক্ষিণদিকে এগোতে চাইলে একেবারে কলকাতায় চলে যাওয়া যায়।

কর্মজীবী মানুষদের ঘরে ফেরার তাড়া আর জন্মাষ্টমীকে উপলক্ষ্য করে শ্রদ্ধালু ভক্তদের যাতায়াতের পথ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে চাকলা ও কচুয়ামুখী পুণ্যার্থীদের ভীড় দেখছিলাম।

চারদিকে জল, খাবার আর ওষুধ বিতরণের রকমারি চটির উপর চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ একটা দৃশ্যের উপর নজর আটকে গেল। দেখলাম গৈরিক পোশাকধারী এক ব্যক্তি পরম স্নেহে এক কন্যাকে কোলের কাছে টেনে নিজের হাতে তাকে জল পান করাতে সচেষ্ট হয়েছেন আর ছোটো মেয়েটাও পরিতৃপ্তির সাথে সেই জল পান করছে। 

অষ্টপ্রহর 'গেরুয়া তাণ্ডব' নামক শব্দবন্ধ শুনতে শুনতে যখন কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়, ঠিক সেই সময় এরকম এক দৃশ্য দেখে মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম সেই দিকে। হঠাৎ কানে ভেসে এল, "হৃদয়পুর রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মে এঁনার আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকান ছিল, সম্প্রতি রেল প্রশাসনের পদক্ষেপে উনি এখন কর্মহীন, তাঁর পরেও ওঁনার সেবাকার্য সত্যি তারিফ যোগ্য।"

দৃষ্টি ঘোরাতেই দেখতে পেলাম এক সুঠাম যুবক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ফিন্যান্স নিয়ে এমবিএ করে বর্তমানে হিসাব নিরীক্ষণকারী এক বহুজাতিক সংস্থার তরুণ কর্মী আকাশ ব্যানার্জি আরো বলল, "বেশ কয়েক বছর ধরেই আমি এঁনাকে বিভিন্ন সেবা কাজ করতে দেখছি।"

আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর কথা শোনার সময় অন্য দিক দিয়ে কানে এল, "সেবা কাজে এঁনার উৎসাহ সত্যি তারিফযোগ্য। বেশ কয়েক বছর ধরে ওঁনাকে দেখছি জন্মাষ্টমী আসার আগে থেকেই উনি সেবা কাজ করার জন্য উতলা হয়ে ওঠেন। নিজের হাতে টাকা না থাকলে উনি পরিচিতদের কাছেও হাত পাততে কুণ্ঠিত হন না।"

ঘাড় ঘোরাতে নজরে এল আমার আর এক দিকে এসে দাঁড়িয়েছে আর এক যুবক। আকাশই সৌম্য দলুইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, "এম ফার্মা করে ও এখন একটা বেসরকারি কলেজে লেকচারার রূপে কর্মরত।"

ফার্মাসি নিয়ে পড়াশোনা করেছে জানতে পেরে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- আকাশ বলছিল, ওঁনার নাকি আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকান ছিল, সত্যি নাকি ?

প্রশ্নটা শেষ হতে যতক্ষণ, কানে ভেসে এল "উনি শুধু শিকড় বা হাতে বানানো ওষুধই বিক্রি করেন না, ওঁনার সংগ্রহে থাকা বেশকিছু ফর্মুলার প্রয়োগ করে আমি নিজে ওষুধ বানিয়ে ও সেটা বিক্রি করে সন্তোষজনক ফলাফল পেয়েছি।"

সৌম্যর কথা শুনে বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওর কাছেই জানতে চাইলাম সত্যি !

পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ হাসতে হাসতে বলল, "ওঁনারা কয়েকজন মিলে 'ওয়েস্ট বেঙ্গল অক্সিজেন ফাউণ্ডেশন' নামে একটা সেবামূলক ট্রাস্টও চালায়, সৌম্য ওই ট্রাস্টের মহাসচিব আর ওই সাধুবাবা সেটলর।"

আকাশ যখন গেরুয়া বসন পরা ব্যক্তির বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছে তখন দূর থেকে দেখতে পেলাম সাধুবাবা কাউকে নিজের হাতে জল বাতাসা দিচ্ছেন তো সৌম্য পুণ্যার্থীদের ক্ষতবিক্ষত পায়ে নিজের হাতে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে।

ওঁদের সম্মিলিত সেবাকার্য দেখতে দেখতে বারবার মনে হচ্ছিল দিমাগী মর্কটগুলো যদি ছোটোবেলা থেকেই এরকম গেরুয়াধারীদের চোখের সামনে বেশি বেশি করে দেখতেন, এঁদের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারতেন বা এঁদেরই মতো সেবাকার্যে নিয়োজিত হতে পারতেন, তাহলে বোধহয় কোনো নিষ্প্রাণ সাদা দেওয়ালে অযথা জোর পূর্বক গেরুয়া রঙ লেপে সমাজে 'গেরুয়া তাণ্ডব' দেখানোর প্রয়োজন পড়ত না।

Comments