কলকাতা (১৬ জুলাই '২৬):- গত সোমবার অর্থাৎ ১৩ জুলাই সমগ্র ভারতে পালিত হল 'গ্যাস্ট্রো ইনটেসটাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার' সংক্ষেপে 'জি আই এস টি' সচেতনতা দিবস (GIST Awareness Day)।
মূল বিষয়ে ঢোকার আগে অতি সংক্ষেপে বলে নেওয়া প্রয়োজন যে 'জিআইএসটি' হল ক্যানসার রোগেরই এক বিশেষ ধরণ। যদিও এটা এক ধরনের ক্যানসার, তবুও চিকিৎসক মহলের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগকে সনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং রোগীর গাফিলতিতে এই রোগকে শরীরে পুষে না রেখে সময়োপযোগী উপযুক্ত চিকিৎসা করা হয়, তাহলে রোগী সুস্থ শরীরে দীর্ঘদিন বাঁচাতে পারেন।
আমাদের পাঠকদের জন্য 'জিআইএসটি' সম্পর্কে সময়োপযোগী তথ্য প্রদান করলেন 'নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত'-এর সার্জিক্যাল অঙ্কোলজি ও সার্জিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগের পরামর্শদাতা চিকিৎসক ডাঃ অভিষেক গঙ্গোপাধ্যায়।
ডাঃ গঙ্গোপাধ্যায়-এর বক্তব্য অনুযায়ী, মূলতঃ ৫ টা উপসর্গ দেখে চিকিৎসকরা 'গ্যাস্ট্রো ইনটেসটাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার' বা 'জিআইএসটি' সনাক্ত করে থাকেন।
'জিআইএসটি'-র এই পাঁচটা উপসর্গ হল :-
১. দীর্ঘদিনের পেটব্যথা বা পেটে অস্বস্তি - খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা ওষুধ সেবনের পরেও যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে পেটব্যথা বা অস্বস্তি থেকে যায়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. অল্প খেয়েই পেট ভরে যাওয়া (আর্লি স্যাটাইটি) - স্বাভাবিকের তুলনায় খুব অল্প খাবার খেলেই যদি পেট ভরে যায়, তাহলে তা পাকস্থলীর ভিতরে কোনো টিউমার বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে পাকস্থলীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
৩. কালো রঙের মল, রক্তবমি বা অকারণ রক্তাল্পতা গ্যাস্ট্রো ইনটেস্টাইনাল - রক্তক্ষরণ হলে অনেক সময় কালো, আলকাতরার মতো মল হতে পারে বা বমির সঙ্গে রক্ত বেরোতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই রক্তক্ষরণ চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু তার ফলে রক্তাল্পতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৪. দীর্ঘদিনের বমিভাব বা বমি, একটানা বমিভাব বা বারবার বমি হওয়ার সঙ্গে যদি পেটব্যথা বা খেতে অসুবিধা থাকে, তাহলে তা গ্যাস্ট্রো ইনটেস্টাইনাল বাধা (অবস্ট্রাকশন) বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
৫. ওজন কমে যাওয়া বা পেটে টিউমার - কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া কিংবা পেটে অস্বাভাবিক ফোলা অনুভব হলে তা কখনওই অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, কারণ এগুলি গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে।
এছাড়াও, যদিও তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়, 'জিআইএসটি'-তে আক্রান্ত কিছু রোগীর টিউমার ফেটে যাওয়া, রক্তক্ষরণ বা অন্ত্রে ছিদ্র হওয়ার কারণে হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা হতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে। ছোট অন্ত্রে 'জিআইএসটি' হলে অন্ত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। আবার বিরল ক্ষেত্রে যদি এই টিউমার খাদ্যনালিতে (ইসোফ্যাগাস) তৈরি হয়, তাহলে খাবার গিলতে অসুবিধা (ডিসফ্যাজিয়া) দেখা দিতে পারে।
'জিআইএসটি'-র অন্যতম বড় সমস্যা হলো, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো উপসর্গই থাকে না বা থাকলেও তা গ্যাস্ট্রাইটিস, পেপটিক আলসার বা সাধারণ বদহজমের মতো পরিচিত সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।
তবে বর্তমানে এন্ডোস্কোপি, আধুনিক ইমেজিং, উন্নত অস্ত্রোপচার পদ্ধতি এবং লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার অগ্রগতির ফলে 'জিআইএসটি'-র চিকিৎসার ফলাফল আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে।
সবশেষে, মনে রাখা জরুরি—সব অম্বল, বদহজম বা হজমের সমস্যা যে ক্যানসারের লক্ষণ, তা নয়।
তবে এই ধরনের উপসর্গ যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, ক্রমশ বাড়তে থাকে অথবা এর সঙ্গে রক্তক্ষরণ, রক্তাল্পতা, বারবার বমি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা পেটে গাঁটের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে তা কখনওই অবহেলা করবেন না। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে 'জিআইএসটি'-সহ অন্যান্য পরিপাকতন্ত্রের গুরুতর রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই সনাক্ত করা সম্ভব।

Comments
Post a Comment